
যেকোন প্রচেষ্টায় সফলতার জন্য প্রায়ই লোকজনকে বারবার আওড়ে যাওয়া কিছু উপদেশ দেওয়া হয়ে থাকে। হোক সেটা ধর্মীয় কিংবা অন্য কোন পথের প্রচেষ্টা, উপদেশগুলো একই থাকে। এরকমই একটা উপদেশ হল আগেভাগে প্রস্তুতি গ্রহণ করা।
মুসাফির তার যাত্রার জন্য প্রস্তুত হয়, ছাত্রছাত্রীরা তাদের পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে। কাজের চাহিদা মেটাতে চাকরিজীবিরাও লাগাতার নানা প্রফেশনাল কোর্স করে থাকেন। অর্থাৎ, কোন কাজে সফল হওয়ার জন্য ভাল প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।
রামাদান মাস যেন আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে। এইতো অল্প কিছুদিন পরেই রামাদান। এক্ষেত্রেও অতি অবশ্যই সেই মূলনীতির কোন ব্যতিক্রম হবে না, যেখানে বলা হচ্ছে যে, “প্রস্তুতিই হচ্ছে সাফল্যের চাবিকাঠি।”
প্রতি বছরই রামাদানকে ঘিরে নেওয়া হয় হরেক রকমের প্রস্তুতি। এর মধ্য থেকে তিনটার কথা বলা যায় :
· রামাদানকে ঘিরে আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার প্রস্তুতি।
· দুনিয়াদারদের রামাদানকেন্দ্রিক প্রস্তুতি।
· ঈমানদারদের রামাদান প্রস্তুতি।
রামাদানকে ঘিরে আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার প্রস্তুতি:
পাঁচটি উপায়ে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের জন্য রামাদানকে প্রস্তুত করেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ইসলামের এই মাসটাকে এতো বেশি পুরস্কার আর সুযোগ দিয়ে ভরিয়ে রেখেছেন যে আর কোন মাসকে তেমনটা রাখেন নি।
এক.
আল্লাহ এটিকে করেছেন সামান্য কয়েক দিনের ব্যাপার। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন,
أَيَامَا مَعْدُودَاتٍ
“সীমিত কয়েকটা দিন মাত্র।” (১)
এটা আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার পক্ষ থেকে আমাদের উপর অসীম, অপার অনুগ্রহ যে মাত্র কয়েকটি ‘লিমিটেড’ দিনের মধ্যেই তিনি আমাদেরকে ‘আনলিমিটেড’, অফুরন্ত পুরস্কার দিতে চান।
দুই
ইনসানের সবচেয়ে ভয়ংকর শত্রু শয়তানকে এসময় রাখা হয় বন্দীদশায়। রামাদানে শয়তান শিকলবদ্ধ থাকে। রামাদানের একেবারে প্রথম দিন থেকে নিয়ে শেষ দিনটি পর্যন্ত চলে তার এই বন্দীত্ব; যাতে করে বছরের অন্য যেকোন সময়ের চেয়ে এই সময়টাকে, ইবাদতের এই মৌসুমকে করে দেওয়া যায় ঈমানদারদের অন্তরের জন্য সহজতর আর হালকা।
রাসূলুল্লাহ বলেন— “যখন রামাদানের প্রথম রাতটি আসে, তখন শয়তান এবং বিদ্রোহী জ্বিনদেরকে শিকলবন্দী করে ফেলা হয়।”[২]
তিন.
একই হাদিসে রাসূলুল্লাহ বলেন, আর জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং একটা দরজাও খোলা থাকে না। ওদিকে জান্নাতের সবগুলো দরজা খুলে দেওয়া হয় আর একটা দরজাও বন্ধ অবস্থায় পড়ে থাকে না।”তা
এই অসাধারণ মাসটির প্রত্যেক রাতে আল্লাহ জাল্লা জালালুহু মুক্ত করে দেন
চার.
এমন অসংখ্য বনী আদমকে, জাহান্নামকেই যাদের জন্য জন্য ঠিক করে দেওয়া হয়েছিল ঠিকানা হিসেবে।
রাসূলুল্লাহ বলেন, “আল্লাহ এ মাসের প্রতি রাতে অনেক লোককে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করেন।”
পাঁচ-
আল্লাহ এই মাসে এমন ভরপুর একটা রাত রেখেছেন যে রাত আল্লাহর দাসত্বে কাটিয়ে দেওয়াটা হাজার মাস আল্লাহর দাসত্ব করার চেয়েও বেশি। হাজার মাস মানে হল তিরাশি বছর চার মাস প্রায়। কিন্তু সেই রাতটায় আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে “হাজারটা মাসের চেয়েও বেশি” পুরস্কারের হাতছানি ! রাসূলুল্লাহ বলেন, “রামাদানে এমন একটি রাত রয়েছে, যে রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম এবং যে এই রাতের ফযিলত থেকে বঞ্চিত হল সে যেন সবকিছু থেকেই বঞ্চিত হল।”যে
এটা হল আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের অসংখ্য প্রস্তুতির মধ্যে হাতেগোণা কয়েকটা মাত্র। কেন আল্লাহর এই বিরাট প্রস্তুতি? কারণ যারা চায় জান্নাতের উচ্চ শিখরে পৌঁছাতে, যারা চায় এর সুবিশাল বাগানগুলোতে ঘুরে বেড়াতে, যারা চায় জান্নাতের সবচেয়ে মূল্যবান উপহারগুলো পেতে এবং যারা চায় তাঁদের রব আল্লাহর কাছে, একেবারে কাছে একটা ঘরের মালিক হতে, সেই তাদের জন্য আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লা এই মাসকে বানাতে চান একটা “পারফেক্ট ওপেনিং”, এক শুভ সূচনা
দুনিয়াদারদের রামাদানকেন্দ্রিক প্রস্তুতি
আমাদের মধ্যে এমন অনেকে আছে যারা ইহসানের বদলা ইহসান দিয়ে দিতে চায় না। এরাই হচ্ছে দুনিয়াদার লোকজন, যারা দুনিয়াতেই ঘরবাড়ি বানানোকে তাদের জীবনের মুখ্য উদ্দেশ্য বানিয়ে নিয়েছে। তারা কিভাবে রামাদানের জন্য প্রস্তুত হয়? এমন এক ভাবে তারা তাদের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে, যার মাধ্যমে রামাদানের উপহারের পুরোটুকু না হলেও অধিকাংশই তারা স্রেফ হারিয়ে বসে।
দুনিয়াদার লোকেরাও রামাদানের প্রস্তুতি নেয় পাঁচভাবে :
এক.
এদের দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকে ফ্রিজের ভেতর খাবার স্তুপ করে রাখার মধ্যে। যেন তারা “মান্থ অব ফাস্টিং” – “সাওমের মাস” পালনের পরিবর্তে “মান্থ অব ফিস্টিং”- “ভোজনের মাস” উদযাপন করতে যাচ্ছে। আমরা কাফিরদের বলে থাকি এই মাস আমাদের ডায়েট ঠিক রাখতে, পরিমিত খাবার দাবার আল্লাহ আমাদের যা দিয়েছেন তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতেও যখন এই কথাগুলো সত্য, তখন আমাদের খাবারের জন্য বেহিসাব প্রস্তুতি, যার ফল দাঁড়ায় ধারাবাহিক ওজন বৃদ্ধি আর খাবারের ভয়াবহ অপচয়, আমাদের কথার সাথে এগুলো পুরোপুরি সাংঘর্ষিক হয়ে যায়।
এছাড়াও আমাদের অতিরিক্ত চাহিদা আমাদের স্ত্রীদের সময়কে নষ্ট করে ফেলে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা অন্তহীন সময় ধরে নানা পদের খাবার তৈরিতে তাদের সময় ব্যয় করেন, যখন কিনা তাদের উচিত ছিল প্রভুর ইবাদাতে বেশি সময় ব্যয় করা। খেয়াল করে দেখুন রামাদানে আপনি কিভাবে খানাপিনা করেন।
রাসূলুল্লাহ বলেন, “দুনিয়াতে যাদের পেটগুলো পরিপূর্ণ থাকবে কিয়ামতের দিনে তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষুধার্ত থাকবে।”[১)
এই হাদীস শোনার পর এর বর্ণনাকারী আবু যুহাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর ইন্তিকালের দিন পর্যন্ত আর কখনো পেট ভরে খাওয়া দাওয়া করেন নি।
ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, “পেট মোটা কোন মানুষের কি অন্তর নরম হতে পারে?” ইমাম আহমাদ জবাব দিয়েছিলেন, “আমি এটা বিশ্বাস করি না।”
দুই.
রামাদান যত ঘনিয়ে আসে দুনিয়াদারদের চেহারায় নাখুশি আর বিরক্তির চিহ্নগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাদের মুখের হাবভাব আর কথাবার্তা থেকেই এটা স্পষ্ট হয়ে যায়।
আল্লাহ আমাদের সবাইকেই খুব ভালো করে জানেন। রামাদানে এমন কিছু মানুষ সিয়াম পালন করে যাদের সিয়াম পালনের একমাত্র কারণ হল তাদের আশেপাশের লোকজনের সিয়াম পালন করা। তারা অধীর হয়ে অপেক্ষা করে যে কখন রামাদান মাস শেষ হবে। এ ধরণের লোকেরা এই ভয় করে না যে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে বলবেন: “তোমার উপবাস থাকার 197 193ার আমার নেই! তুমি আমার ইবাদাতকে ঘৃণা করতে এবং তাই আজকের দিনে আমার সাথে তোমার কোন সম্পর্ক নেই।”
এই যে রামাদানের প্রতি এই বিতৃষ্ণা অথবা ইসলামের যেকোন বিষয়ের প্রতিই ঘৃণা, এসব একজন মানুষের আখিরাতকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়। আল্লাহ এই ধরণের লোকদের সম্পর্কে বলছেন :
ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ كَرِهُوا مَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأَحْبَطَ أَعْمَلَهُم
“এটা এজন্যে যে, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তারা তা অপছন্দ করেছে। কাজেই তিনি তাদের আমলসমূহ নিষ্ফল করে দিয়েছেন।” [১]
তিন.
রামাদানের জন্য প্রস্তুত হতে গিয়ে তারা অধীনস্তদের কর্মঘণ্টাকে নিয়ন্ত্রণ করে। এটা এজন্য করে না যাতে করে তাদের অধীনস্তরা ইবাদাত আর কুরআন তিলাওয়াতের জন্য সময় পায়। এই কাজটা তারা করে সাওম পালনের সময় তাদের ঘুমানোর সুযোগকে সর্বোচ্চ পরিমাণে বাড়িয়ে তোলার জন্য।
চার
আগে থেকেই তারা ঠিক করে রাখে যে না খেয়ে থাকার সময়টুকু তারা কোন কোন টিভি সিরিজ দেখে কাটাবে। রামাদানের জন্য ব্যতিক্রম হিসেবে তারা নব্বই মিনিটের ফুটবল ম্যাচ পুরোটুকুই দেখে, শুধু হাইলাইটস দেখে সন্তুষ্ট থাকে না। তাদের কাছে সময় নষ্ট করাটাই সবচেয়ে জরুরি। এরচেয়েও খারাপ কাজ করে সেই মানুষগুলো যারা ইফতারের পরে এমন লোকদের সাথে মেশে বা এমন জায়গায় যায় যাদের সাথে থাকলে বা যেসব জায়গায় গেলে আল্লাহর অবাধ্যতা হয় আর এর মাধ্যমে সাওম পালনের মাধ্যমে যেটুকু সাওয়াব তারা অর্জন করেছিল, সেটুকুও একেবারে খুইয়ে বসে।
পাঁচ
দুনিয়াদার লোকেরা এমন সব মসজিদ খুঁজে নেয় যেগুলোতে সবচেয়ে সংক্ষিপ্তাকারে তারাবীহর সালাত আদায় করা হয়। তাদের এমন করার কারণ এজন্য না যে পরেরদিন তাদেরকে সকাল সকাল উঠে কাজে যেতে হবে, বরং সালাত তাদের কাছে বোঝার মত মনে হয়। এটা বিস্ময়কর কিছু নয়, কারণ স্বয়ং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলাই বলেছেন,
وَإِنَّهَا لَكَيرَةُ إِلَّا عَلَى الْخَشِعِينَ
“আর নিশ্চয় বিনয়ীরা ছাড়া তা অন্যদের উপর কঠিন।
এভাবেই দুনিয়াদাররা রামাদানের জন্য প্রস্তুতি নেয়। সুবহানাল্লাহ, আল্লাহ কীভাবে তাদের সাথে আচরণ করেন আর তারা কীভাবে আল্লাহর সাথে আচরণ করে, এই দুইয়ের মধ্যে তুলনা করে দেখুন। আল্লাহ তাদের ডাকেন আর তারা সেই ডাক থেকে পালিয়ে যায়। আল্লাহ একটার পর একটা সুযোগের দরজা তাদের জন্য উন্মুক্ত করে দেন আর তারা সেটাকে দড়াম করে বন্ধ করে দেয়৷ তারা তাদের রবের সাথে এমন আচরণ করে যেন আল্লাহর তাদেরকে দরকার আর তাদের আল্লাহকে কোন দরকার নেই। নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক।
ঈমানদারদের রামাদান প্রস্তুতিঃ
ঈমানদারদের রামাদান প্রস্তুতি একেবারেই আলাদা। তাদের তো স্লোগান হয়, “ও রামাদান! জলদি চলে এসো তুমি, আমাদের গুনাহগুলো তো বড় বেশি ভারী আর অন্তরগুলো তো বড়োই দুর্বল!” যেহেতু তারা জীবনকে আখিরাতের লেন্স দিয়ে দেখে, তাই তাদের প্রস্তুতি হয় উপরের লোকগুলো থেকে পুরো বিপরীত মেরুর। তাহলে কিভাবে তারা প্রস্তুতি নেয়?
আখিরাত পিয়াসী বান্দারা রামাদানের প্রস্তুতি নেয় পাঁচভাবে:
এক.
তারা আল্লাহর কাছে আবেগময় দুআ করে যাতে করে আল্লাহ তাদেরকে আরো একটি রামাদানের সাক্ষী হিসেবে কবুল করে নেন। এমন একটি মাস যেটা অসম্ভব প্রয়োজনীয় সুযোগ আর মিস না করার মত অসংখ্য পুরস্কারে ভরপুর। মু’আল্লা ইবনুল ফাদ্বল বলেন, “তারা রামাদানের ছয় মাস আগে থেকেই দুআ করতেন যাতে করে আল্লাহ তাদের রামাদানে পৌঁছে দেন, এই মাসের সাক্ষী বানান।”
ইয়াহইয়া ইবনু আবি কাসীর তার দুআয় আরো বলতেন, “ও আল্লাহ! আমাকে রামাদানের কাছে পৌঁছিয়ে দিন আর রামাদানকে আমার কাছে পৌঁছিয়ে দিন। আর আমার কাছ থেকে এটাকে কবুল করে গ্রহণ করে নিন।”[১]
দুই.
তারা আগে থেকেই নিখুঁত নিয়ত নিয়ে প্রস্তুত হয়ে যায়। রামাদানের প্রতিটা দিনে তারা সতেজ হয়ে উঠে। এই উপলব্ধি তাদের থাকে যে নিয়তের নির্দিষ্ট ধাঁচের সঙ্গেই গুনাহর মাগফিরাত সরাসরি সম্পর্কিত থাকে। রামাদানে এমন তিনটা সুযোগ থাকে যার মাধ্যমে নিজের গুনাহর বোঝা সম্পূর্ণরূপে শূন্য হয়ে যায়। কিন্তু এজন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শর্ত আছে, যেটা তিনটা বৰ্ণনায় পরিষ্কারভাবে উঠে এসেছে।
প্রথম সুযোগের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ বলেন, “যে ব্যক্তি রামাদানের পুরো মাসে ঈমান নিয়ে ও পুরষ্কারের আশায় সিয়াম পালন করবে, তার পূর্বের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।” দ্বিতীয় সুযোগের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ বলেন, “যে ব্যক্তি রামাদানের রাতে ঈমান নিয়ে ও পুরষ্কারের আশায় সালাত আদায় করবে, তার পূর্বের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।”।
তৃতীয় সুযোগের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ বলেন, “যে ব্যক্তি লাইলাতুল কদরে ঈমান নিয়ে ও পুরস্কারের আশায় সালাত আদায় করবে, তার পূর্বের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।” এই তিনটা সুযোগই নিয়তের সাথে সম্পৃক্ত। এভাবেই এই ক্যাটাগরির লোকেরা আল্লাহকে আগ্রহভরে দেখিয়ে দেয় যে রামাদানকে পেয়ে তারা খুশি, দুঃখিত নয়। তারা সিয়াম পালন করেছে পুরস্কার পাবার তীব্র ইচ্ছায়, এজন্য না যে অন্যরা রাখছে, তাই তারাও রাখছে। এই নিয়তকে তারা প্রতিদিনই নবায়নকরে নেয়।
তিন-
আখিরাতপ্রেমী ঈমানদার বান্দারা রামাদানের প্রস্তুতিস্বরূপ রামাদান মাস আসার আগে থেকেই কুরআনের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলে। একইসাথে রামাদানের আগেই তারা শুরু করে সাওম আর রাতের ইবাদত। আগেভাগে ওয়ার্ম আপ না করে কোন অ্যাথলেটই প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় না, কোন বক্সারও আগে থেকে ট্রেনিং এর প্রতি আন্তরিক না হয়ে বারো রাউন্ড দীর্ঘ লড়াইয়ে জেতার স্বপ্নও দেখতে পারে না। একইভাবে আখিরাত পিয়াসী মানুষগুলো রামাদানের জন্য ওয়ার্ম আপ সেরে নেয় আগেভাগেই যাতে করে তারা আসামাত্রই দৌড়তে পারে। আমাদের কেউ কেউ ধরে নেয়, রামাদান এলেই ঈমানের দশা রাতারাতি একবারে এক রাতের মধ্যেই পাল্টে যাবে। এ যেন একটা বাটন, চাপলেই কাজ হয়ে যায়। অনেকেরই রামাদানের প্রথম কয়েকদিনে খুব উৎসাহ উদ্দীপনা থাকে, কিন্তু এক সপ্তাহ বা তার পরেই দেখা যায় উদ্দীপনার জোয়ারে ভাটা পড়ে যায়। বেশিরভাগ সময়েই এটা হয় যথাযথ প্রস্তুতি না থাকার কারণে। এজন্যই ঈমানদাররা সময় থাকতেই প্রস্তুত হয়
চার.
রামাদান আসার আগেই মুমিনরা তাদের এমন প্রত্যেকটি গুনাহর মূল্যায়ন করে ও সেগুলোর প্রতি মনোযোগ দেয় যেগুলো নিয়ে তারা নিজেদের সাথে সংগ্রামে লিপ্ত হয়ে আছে। তারা সেসব গুনাহের জন্য আল্লাহর কাছে তাওবাহ করে। এই সবকিছুই তারা রামাদান আসার আগেই সেরে নেয়। তারা সেইসব লোকদের মত আল্লাহর সাথে তামাশায় লিপ্ত হয় না যারা বলে রামাদান আসার আগে যত পারি গুনাহ করে নেওয়া যাক আর রামাদান এলে তখন না হয় সব ছেড়েছুড়ে ভালো হয়ে যাব। ঈমানদাররা রামাদানের আগে থেকেই গুনাহ ত্যাগ করতে শুরু করে দেয়।
মুমিনরা এরকম করে এজন্যই যে তারা দেখে প্রতি বছরই অসংখ্য মুসলিম রামাদান পায় কিন্তু সেই সময় তারা না পারে খুব বেশি তিলাওয়াত করতে, না পারে অতিরিক্ত সালাত পড়তে, আর না পারে সময়ের বিরাট ব্যবহার করতে। কিছুই তারা ঠিকঠাক করতে পারে না। ঠিক এই বইয়ে বর্ণিত প্রথম রূপক গল্পের মত। ফলে রামাদান শেষ হয়ে গেলেও রামাদান তাদের উপর খুব কমই প্ৰভাব ফেলতে পারে। কোন জিনিসটি তাদের এভাবে পেছনে ফেলে রাখলো? এটা হচ্ছে সেই গুনাহগুলো যা থেকে তারা রামাদানের আগেই বিরত হয়ে যায় নি। গুনাহ হচ্ছে সেই আঘাতের মত যা একটা মানুষের ইবাদাতের স্বাদ উপভোগের সক্ষমতাকে ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। আর যেহেতু রামাদান ইবাদাতের মাস, তাই ঈমানদার মানুষজন এই মাসে আল্লাহর কাছে যাবার মিষ্টতা থেকে বঞ্চিত হয়ে যাবার আশংকায় থাকেন সর্বদা।
উহাইব ইবনুল ওয়ারদকে জিজ্ঞেস করা হয়, “সবসময় গুনাহ করে এমন কেউ কি কখনো ইবাদাতের মিষ্টতা উপভোগ করতে পারে?” তিনি জবাব দিলেন, “না। এমনকি যে গুনাহর ইচ্ছা করে, সেও নয়।”
যেভাবে অসুস্থ শরীর খাবারের মজা বুঝতে অক্ষম হয়ে পড়ে, সেভাবেই অসুস্থ অন্তর গুনাহ করে ইবাদাতের স্বাদ উপভোগ করতে অক্ষম হয়ে পড়ে। একজন ব্যক্তি কোন হারাম কোন জিনিসের প্রতি তার কামনা নিয়ে দৃষ্টিপাত করার সাথে সাথে তার কুরআন তিলাওয়াতের মজা, কুরআন তিলাওয়াতের স্বাদ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। একইভাবে একজন মানুষ হারাম যোগাযোগ, হারান নিঃশ্বাস, হারান কথোপকথন, হারাম অর্থনৈতিক লেনদেন এবং এমন আরো অনেক হারামে লিপ্ত হয়ে পড়তে পারে এবং এগুলোর কারণে তাৎক্ষণিকভাবে তার সালাত, দা’ওয়াহ, দুআ এবং আরো অনেক ইবাদাতের প্রতিই ভালোবাসা নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
এরকম একজন মানুষ হয়তো এটা ভেবে অবাক হতে পারে যে সে এতো এতো গুনাহ করছে অথচ তা উপর আল্লাহর শাস্তি আপতিত হচ্ছে না। আল্লাহ তাকে শাস্তি দিচ্ছেন না। বাস্তবে সে যে সবদিক থেকেই নিকৃষ্ট শাস্তির মধ্যে রয়েছে. কিন্তু সে এটা দেখতে পারছে না, এটা সে বুঝে উঠতে পারে না। অ হবার আর আখিরাতের জন্য কাজ করবার আনন্দকে তার কা নেওয়া হয়েছে, এটা তার বুঝে আসে না। এটা কি শাস্তি হিসেবে কম কিছু? ইমাম ইবনুল কায়্যিম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “অন্তর কঠিন হয়ে যাওয়া আর আল্লাহর থেকে দূরে যাওয়ার অনুভূতির চেয়ে কঠিন, নিকৃষ্ট কোন শাস্তি আর কিছুই হতে পারে না। এজন্যই আখিরাতের আশায় থাকা মানুষেরা এইসব বাধাবিপত্তি অর্থাৎ গুনাহ দূর করার মাধ্যমেই রামাদানের জন্য প্রস্তুতি নেয় এবং সেটা করে রামাদান আসার আগে আগেই।
পাঁচ.
রামাদানের জন্য প্রস্তুত হতে তারা একটা সমন্বিত কর্ম পরিকল্পনা তৈরি করে। তারা এরকম টার্গেট রাখে না যে “আমি যতটুকু সম্ভব কুরআন তিলাওয়াত করবো”; বরং তারা নিয়ন্ত্রিত পরিকল্পনা গ্রহণ করে, জানে ঠিক কতোটুকু তারা রামাদান থেকে প্রত্যাশা করে।
লেখক,
মোঃ মনিরুল ইসলাম
আল হাদীস এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়া
Reporter Name 

















