মাঃ শফিউল আযম, স্টাফ রিপোর্টার, পাবনা :
মৎস্যভান্ডার খ্যাত পাবনায় দেশি মাছের আকাল চলছ। জলার অধিকাংশ নদ-নদী, খাল-বিল ও জলাশয় শুকিয় যাওয়ায় দেশি মাছের সঙ্কট চলছ। এরফলে হাট-বাজারে প্রাকতিক উৎসের দেশি মাছের জায়গা দখল করেছে চাষের দেশি ও হাইব্রিড মাছ। দেশী প্রজাতি মাছ কৈ, পাবদা, টেংরা, পুঁটি, মলা, চেলা, ভ্যাদা, রায়াক, বাইম, খলিসা, ফলি, চিংড়ি, গজার, চিতল, কাকিলা, বরানীসহ প্রায় ৫০ প্রজাতির মাছ আগের মতা পাওয়া যায় না।
পাবনা জেলায় ২২ হাজার৭৬৫ হেক্টর আয়তনের ২৩৩টি প্লাবনভূমি, ১৭ হাজার ৫৭৬ হেক্টর আয়তনের ১৬টি নদী, দুই হাজার ৪৭৬ হেক্টর আয়তনের ২১২টি বিল, ৫২৮ হক্টর আয়তনের ১০৬টি খাল, আট হাজার ১০৪ হেক্টর আয়তনের ৩৯ হাজার ১০২টি পুকুর ও দুই হাজার ৪৩০ হেক্টর আয়তনের দুই হাজার ১১০টি বানিজ্যিক মৎস্য খামার রয়েছ। জলার ৮০ শতাংশ বিল, নদী ও প্লাবনভূমি ভরাট হয়ে ফসলী জমিতে পরিনত হয়ছে। অবশিষ্ঠ নদী বিল পানি প্রবাহ কমে যাওয়ায় জেলেদের জালে পর্যাপ্ত মাছ ধরা পড়ছে না।
পৌষ-মাঘ-ফাল্গুন মাস নদী, খাল, বিল ডোবার পানি কমতে থাকলে দেশি মাছ ধরার ধুম পড়ে যেত। এখন এসব মাছ তেমন দেখা যায় না। বর্ষাকালে ধানের জমিতে কৈইয়া জাল, বড়শি ও চাঁই পেতে মাছ ধরার রীতিও হারিয়ে গেছে অনেক এলাকা থেকে। এক সময় যারা পুকুর, খাল-বিল, ডোবা, নালায় মাছ ধরে পরিবারের চাহিদা পূরণ করতেন, এখন তাদেরকে বাজার থেকে মাছ কিনতে হচ্ছে । দেশি মাছের আমদানি কম হওয়ায় দাম আকাশছোঁয়া। এতে মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র মানুষের ভরসা চাষের দেশি ও হাইব্রিড মাছ।
পাবনা মৎস্য বিভাগের একটি সূত্র জানিয়েছেন, হারিয়ে যাওয়া দেশি প্রজাতির মাছের সংখ্যা পঞ্চাশের বেশি। হাটবাজারে এখন আর মিঠাপানির সুস্বাদু দেশি মাছ মিলছে না। দেশি হাইব্রিড জাতর সিলভার কার্প, গ্রাস কার্প, মিরর কার্প, কমন কার্প, বিগহড, থাইসরপঁুটি, থাই কৈ, থাই পাঙ্গাস, ব্লাক কার্প, আফ্রিকান মাগুর, পঁাচ প্রজাতির তলাপিয়াসহ ২৪ প্রজাতির মাছ চাষ হচ্ছে। হাইব্রিড জাতের মাছ চাষের আগে পুকুর ডোবার পানিতে নানা প্রকার বিষ মেশানোর কারনে মাছ, শামুক ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। মৎস্যজীবিরা জানিয়েছেন, অধিক মুনাফার আশায় হাইব্রিড মাছের চাষ করতে গিয়ে জলাশয়গুলা থেকে দেশি মাছের বিলুপ্ত ঘটানা হয়েছে।
মৎস্য বিভাগের সূত্র জানিয়েছছে, তিন দশক আগে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রায় আড়াই’শ প্রজাতির মিঠা পানির মাছ পাওয়া যেত। বেড়া চতুরবাজারের মাছ ব্যবসায়ী সাঁথিয়া উপজলার পানশাইল গ্রামের আদম আলী বলেন, ‘৩০-৩৫’ বছর আগে আমাদের এলাকায় মাছ কিনে খাওয়ার তেমন রেওয়াজ ছিল না। কেনার মেধ্য শুধু ইলিশ মাছ কেনার কথাই মন পড়ে। মাছের প্রয়াজন হলে সবাই বাড়ীর সামনে খাল বা নদীতে চলে যেত। খাল বিলে তখন এতো মাছ ছিল য, পানিতে জাল ফেল্লে- ই মাছ ধরা পারতো।
এ প্রসঙ্গে বিল গাজনা গ্রামের মৎস্য খামারি সতীশ হলদার বলেন, তাদের বাড়ীর পাশে গাজনার বিল ও বাদাই নদী। জন্মের পর থেকেই বিল দেখেছি। ৩০-৩৫ বছর আগে সারা বছর ধরে বাড়ির সবাই বিল থেক মাছ ধরতো। শীত মওসুমে শত শত মানুষ পলো, জাল, ডালা, খুচন নিয় মাছ ধরতে নেমে যেত। কেউ কেউ খালি হাতে মাছ ধরত। বোয়াল, কাতল, মৃগল, লওলা, শাল, গজার, কৈ, মাগুর, শিং, পাবদা, টংরা, পঁুটি, আইড়, ভ্যাদা, বাইম, খলিসা, ফলি, চিংড়ি, চিতলসহ বিভিন্ন জাতর মাছ ধরা পড়ত। এখন বিল নদী শুকিয়ে যাওয়ায় শুটকি উৎপাদন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছ।
টলট গ্রামের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কালা মিয়া, আবু ফকির, কালাম ব্যাপারী জানান, স্থানীয় চতুর বাজারে প্রতিদিন দেশি প্রজাতির অনেক মাছ উঠতো। এখন আর বাজারে সেসব মাছ ওঠে না। বাজারে ভরা থাকে চাষের দেশি বিভিন্ন প্রজাতির বিদেশি সিলভার কার্প, গ্রাস কার্প, মিরর কার্প, কমন কার্প, বিগহড, থাইসরপঁুটি, থাই কৈ, থাই পাঙ্গাস, ব্লাক কার্প, আফ্রিকান মাগুর, তেলাপিয়া। দেশি মাছ কমে যাওয়ার কারণে হিসেবে তারা নদী, বিল জলাশয় শুকিয়ে যাওয়া, ইরি ধান ও অন্যান্য সবজিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারকে দায়ী করন।
সঁাথিয়া উপজলার আফড়া গ্রামের কয়েকজন প্রবীণ ব্যক্তি জানান, প্রায় ৪০-৪৫ বছর আগে পদ্মা, যমুনা ও হুড়াসাগর নদী সংযুক্ত এলাকার ইছামতি, সুতিখালি, কাগশ্বরী, আত্রাই ও বাদাই নদীতে ইলিশসহ প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। এরমধ্যে ১৬ থেকে ১৮ কজি ওজনের বোয়াল, পাঙ্গাস, বাঘাইড়, কাতল ও আইড় মাছ। এমন কোনো মাছ ছিল না যা এ অঞ্চলর নদী-বিল পাওয়া যেত না। এলাকার গাংভাঙা, ঘুঘুদহ মুক্তার, গাজনাসহ অন্যান্য বিলে তারা জাল দিয় ৮ কেজি ওজনের কালবাউশ মাছ ধরেছেন। এখন আর সেদিন নেই বলে তারা জানিয়েছেন।
পাবনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাঃ আবুল কালাম আজাদ বলেন, নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর, জলাশয় ও প্লাবন ভূমি ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি ধারনক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। সরকারি উদ্যাগে নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর, জলাশয় ও প্লাাবন ভূমি পূনঃখননের মাধ্যমে পানি ধারনক্ষমতা বাড়ানা হলে মাছের উৎপাদন বদ্ধি পাবে। অন্যথায় দেশীয় প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির তালিকায় ঠঁাই নেবে।
বেড়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাঃ নাসির উদ্দিন বলেন, বিভিন্ন কারণেই দেশি প্রজাতির মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। পাবদা, গাংসা, বোয়াল, আইড়, শিং মাছের চাষ হচ্ছে। পাঙ্গাসের চাষ হচ্ছে বেশি ক’বছর আগে থেকেই। কৈ মাছেরও চাষ হচ্ছে। দেশি প্রজাতির মাছ রক্ষায় মৎস্য অধিদফতের প্রতি বছর্ মৎস্য মেলার আয়োজন করে আসছে।
Reporter Name 



















