
শফিউল আজম, পাবনা প্রতিনিধি:
পাবনা জেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে পাটের দাম মণপ্রতি গড়ে প্রায় ৬০০ টাকা কমে যাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন প্রান্তিক ও বর্গাচাষিরা। বর্তমানে মানভেদে প্রতি মণ পাট ৩ হাজার ৪০০ থেকে ৩ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। উৎপাদন ভালো হলেও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। কৃষকদের অভিযোগ, বাজারে নগদ অর্থের সংকট এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাবের কারণে পাটের দাম কমে গেছে। অনেক ব্যবসায়ী কম দামে পাট কিনে গুদামজাত করছেন। পরে বাজারদর বাড়লে সেই পাট বেশি দামে বিক্রির পরিকল্পনা রয়েছে বলে দাবি তাদের।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে পাবনা জেলায় ৪৩ হাজার ৪১৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ১ হাজার ৩৬৫ হেক্টর বেশি। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ফলন হয়েছে। জেলায় মোট উৎপাদন দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ২১ হাজার ৫৬২ টন। উৎপাদিত পাটের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ উন্নত ও মাঝারি মানের।
বেড়া উপজেলার হরিরামপুর গ্রামের কৃষক আক্তার মোল্লা জানান, দুই একর জমিতে তোষা পাট চাষ করে ৪৮ মণ ফলন পেয়েছেন। উৎপাদনে প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ব্যয় হলেও পাট বিক্রি করে পেয়েছেন প্রায় ১ লাখ ৬৮ হাজার টাকা। এতে প্রায় ৭ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে। তিনি বলেন, অর্থের প্রয়োজন থাকায় প্রান্তিক কৃষকদের পক্ষে দীর্ঘদিন পাট মজুদ করে রাখা সম্ভব নয়। স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, আর্থিকভাবে সচ্ছল কৃষক ও বড় ব্যবসায়ীরা পাট গুদামজাত করে রাখলেও ছোট কৃষকদের প্রয়োজনের তাগিদে কম দামেই বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে লাভবান হচ্ছেন মধ্যস্বত্বভোগীরা। আতাইকুলা হাটের ব্যবসায়ী কামাল সরকার বলেন, পাবনার বিভিন্ন হাট থেকে পাট কিনে খুলনা ও নারায়ণগঞ্জের বড় আড়ত এবং রফতানিকারকদের কাছে সরবরাহ করা হয়। তার মতে, বাজারে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ না থাকায় বড় ব্যবসায়ী চক্রই মূল্য নির্ধারণে প্রভাব ফেলছে।
পাট রফতানিকারক শাহিন রেজা জানান, সাধারণ মানের পাটের দাম ৩ হাজার ৪০০ থেকে ৩ হাজার ৬০০ টাকার মধ্যে থাকলেও উন্নত মানের ‘এ’ ও ‘বি’ গ্রেডের পাটে অতিরিক্ত ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। তবে অর্থসংকটের কারণে অনেক রফতানিকারক ও বেসরকারি জুট মিল পর্যাপ্ত পাট কিনতে পারছে না। ব্যবসায়ীদের মতে, এ বছর পাটের উৎপাদন ও গুণগত মান ভালো হলেও গত মৌসুমের বকেয়া অর্থ পরিশোধ না হওয়ায় বাজারে নগদ টাকার সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে নতুন করে বড় পরিসরে পাট কেনা সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে কৃষকেরা জরুরি আর্থিক প্রয়োজন মেটাতে কম দামে পাট বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। বাংলাদেশ জুট মিল করপোরেশনের (বিজেএমসি) সাবেক কর্মকর্তা মো. সাইদুর রহমান বলেন, প্রান্তিক ও বর্গাচাষিরা আর্থিক চাপের কারণে মৌসুমের শুরুতেই কম দামে পাট বিক্রি করে দেন। পরে সেই পাটই মজুদদারদের মাধ্যমে বেশি দামে বাজারে আসে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পাট ও পাটজাত পণ্যের চাহিদা বাড়লেও উৎপাদক কৃষকেরা সেই সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। অন্যদিকে বেড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ নুসরাত কবীর বলেন, পাবনার মাটি ও আবহাওয়া পাট চাষের জন্য অনুকূল। সময়মতো বৃষ্টিপাত ও সেচ সুবিধা থাকায় কৃষকদের পাট জাগ দিতে তেমন সমস্যা হয়নি। তার দাবি, এ বছর ফলন ও পাটের মান ভালো হয়েছে এবং মানভেদে কৃষকেরা সন্তোষজনক দাম পাচ্ছেন।
Reporter Name 








