
রাজশাহী মহানগর পুলিশের (আরএমপি) সদর দপ্তর যেন বারবারই আশ্রয় হয়ে উঠছে একটি বিতর্কিত নামের—হেডমোহরার কাজী মো. শাহ আলম। একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ, বিভাগীয় মামলা, সাময়িক বরখাস্ত ও আদালতের স্থগিতাদেশের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কীভাবে তিনি বহাল তবিয়তে চাকরি চালিয়ে যাচ্ছেন সে প্রশ্ন এখন কেবল সাধারণ মানুষের নয়, পুলিশ বাহিনীর অভ্যন্তরেও আলোচনার কেন্দ্রে।
সর্বশেষ গত ২৭ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে আরএমপি কমিশনার মোহাম্মদ আবু সুফিয়ানের স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে কাজী মো. শাহ আলমকে উপ-পুলিশ কমিশনার (কাশিয়াডাঙ্গা) কার্যালয় থেকে বিভাগীয় পুলিশ হাসপাতালে বদলি করা হয়। কিন্তু লিখিত আদেশ থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে তিনি নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন আরএমপি সদর দপ্তরেই এমন অভিযোগ উঠেছে।
এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে ৩ জানুয়ারি ২০২৬ শনিবার সকাল থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত একাধিকবার রাজশাহী বিভাগীয় পুলিশ হাসপাতালে গিয়ে তার উপস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া হয়। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট কেউই নিশ্চিত করতে পারেননি তিনি সেখানে নিয়মিত অফিস করছেন কি না। অথচ একই দিন বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে আরএমপি সদর দপ্তরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কাজী মো. শাহ আলম সেখানেই দাপ্তরিক কাজে ব্যস্ত।
বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রথমে তিনি সদর দপ্তরে দায়িত্ব পালনের কথা অস্বীকার করেন। পরে কথাবার্তার এক পর্যায়ে স্বীকার করেন যে বর্তমানে তিনি পুলিশ হাসপাতালে নয়, বরং আরএমপি সদর দপ্তরেই অফিস করছেন। এ সময় তিনি বলেন, কয়েক দিনের মধ্যেই আমার অফিস আদেশ হয়ে যাবে। তার এই বক্তব্য থেকেই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে লিখিত বদলি আদেশ কার্যকর হওয়ার আগেই কীভাবে তিনি ভিন্ন দপ্তরে দায়িত্ব পালন করছেন।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, পাবনার কাশীনাথপুর এলাকার এক প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষকের ছেলে কাজী মো. শাহ আলম ২০০০ সালে রাজশাহী মহানগর পুলিশে তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে যোগ দেন। ২০০৩ সালে হেডমোহরার পদে পদোন্নতির পর থেকেই তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসতে থাকে। বদলি বাণিজ্য, পদোন্নতিতে তদবির, ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ, পুলিশ রেশন স্টোরে নিম্নমানের পণ্য সরবরাহ এবং কমিশন লেনদেনের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত।
অভিযোগ রয়েছে, আরএমপির বিভিন্ন থানায় ওসি, এসআই ও কনস্টেবল বদলিতে তিনি প্রভাব খাটাতেন এবং এর বিনিময়ে অর্থ আদায় করতেন। পাশাপাশি সদর দপ্তরের পুলিশ রেশন স্টোরের টেন্ডার ও কোটেশন প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এমনকি ২০১২ সালে আরএমপিতে নিয়োগ পাওয়া আটজন সিভিল কর্মচারী তার আত্মীয় এমন অভিযোগ সে সময় ব্যাপক আলোড়ন তোলে।
এই সব অভিযোগের প্রেক্ষিতে ২০১৫ সালে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের হয় এবং ২০১৭ সালের ৩ আগস্ট তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। পরবর্তীতে তিনি হাইকোর্টে রিট করে সাময়িক স্থগিতাদেশ পান, যার সর্বশেষ মেয়াদ ছিল ২০২০ সালের ২ জুলাই পর্যন্ত। তবে স্থগিতাদেশের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কীভাবে তিনি আবার সক্রিয়ভাবে চাকরি করছেন, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
পুলিশের ভেতরের একাধিক সূত্র দাবি করেছে, দীর্ঘদিন ধরে উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কৌশলী সম্পর্ক গড়ে তুলে তিনি নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছেন। সাবেক আরএমপি কমিশনার মনির উজ-জামানের সময় তার বিরুদ্ধে একাধিক লিখিত অভিযোগ জমা পড়লেও সেগুলোর তদন্ত প্রতিবেদন কখনো প্রকাশ পায়নি। এমনকি এক সময় তদন্তের দায়িত্বে থাকা এক সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার গণমাধ্যমে স্বীকার করেছিলেন, উপর মহলের চাপের কারণে তিনি স্বাধীনভাবে তদন্ত করতে পারেননি।
দুর্নীতির অভিযোগের পাশাপাশি তার নামে-বেনামে বিপুল সম্পদের তথ্যও আলোচনায় রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, রাজশাহীর মহিষবাথান এলাকায় তার স্ত্রীর নামে ছয়তলা ভবন, রাজশাহী ও পাবনায় জমিজমা এবং আরডিএ ভবনে দোকান বরাদ্দ রয়েছে। যদিও কাজী মো. শাহ আলম এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছেন।
এদিকে একাধিকবার বদলি আদেশের পরও তার সদর দপ্তরমুখী প্রত্যাবর্তন রাজশাহী মহানগর পুলিশের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পুলিশের একাধিক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, একজন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীর বিরুদ্ধে এত অভিযোগ থাকার পরও যদি কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে বাহিনীর ভেতরে হতাশা তৈরি হয় এবং সাধারণ মানুষের আস্থাও ক্ষুণ্ন হয়।
সচেতন নাগরিকদের মতে, এই বিতর্কের অবসান ঘটাতে কাজী মো. শাহ আলমকে রাজশাহীর বাইরে বদলি করা, তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত সব অভিযোগের নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং তদন্তের ফল অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। তবেই পুলিশ বাহিনীতে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা পাবে এবং জনমনে দৃঢ় হবে এই বিশ্বাস আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আরএমপির মিডিয়া মুখপাত্র উপ-পুলিশ কমিশনার গাজিউর রহমান বলেন, কাজী মো. শাহ আলমের পোস্টিং বিভাগীয় পুলিশ হাসপাতালে। তবে কাজের প্রয়োজনে তিনি কখনো কখনো পুলিশ অফিসে আসেন।
ই-মেইল: swadesherkhobor@gmail.com